- Get link
- X
- Other Apps
জিয়া-খালেদা-তারেকের মতো একই পরিবারে তিন রাষ্ট্রনেতা ছিলেন কারা
জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে আগামীকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকার গঠিত হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ সরকারের প্রধান হচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে তারেক রহমান এবং তাঁর পরিবারের ঝুলিতে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন এক রেকর্ড।
বিশ্বে অল্প কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবার আছে, যাঁদের তিন সদস্য কোনো দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানের গুরুদায়িত্ব সামলেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের শপথের মধ্য দিয়ে এই পরিবারগুলোর তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছে জিয়া পরিবারও। বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার পর এবার বাংলাদেশ পরিচালনার ভার নিচ্ছেন ছেলে তারেক রহমান।
রাজতন্ত্র বাদে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোন দেশে কোন কোন পরিবারের একাধিক সদস্য দেশ পরিচালনা করেছেন, সেটা দেখে নেওয়া যাক:
বাংলাদেশে জিয়া পরিবার
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত জিয়াউর রহমান। সেনাপ্রধান হন তিনি। এরপর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করা হয় তাঁকে। বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ এস এম সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান নিজে চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন করেন। ১৯৯১ সালের পর থেকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই দলটি এবার নিয়ে চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলো। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তখন খালেদা জিয়া ছিলেন পুরোদস্তুর গৃহিণী। স্বামীহারা খালেদা দলের হাল ধরেন। যুক্ত হন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে।
রাজনীতিতে এসে রাজপথের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান খালেদা জিয়া। চষে বেড়ান দেশের নানা প্রান্ত। এর ফলও পান। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর তিনি তিন দফা সরকারপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন।
বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের একাধিক সাধারণ নির্বাচনে একাধিক আসনে দাঁড়িয়ে কখনোই কোনোটিতে না হারার অনন্য রেকর্ড রয়েছে তাঁর দখলে। গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন।
মায়ের মৃত্যুর পর তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান হন। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এখন বাবা-মায়ের পর তিনিও দেশ চালানোর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। এর আগে গত ডিসেম্বরে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন ছেড়ে যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তিনি।
ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারত স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। নতুন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন জওহরলাল নেহরু। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এই নেতা স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়ও নেহেরু ভূমিকা রেখেছেন। আর স্নায়ুযুদ্ধকালে সদ্যস্বাধীন ভারতকে জোট নিরপেক্ষ হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যেতেও নেহরুর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
দীর্ঘদিন অসুস্থতায় ভোগার পর ১৯৬৪ সালের ২৭ মে রাজধানী দিল্লিতে মারা যান প্রধানমন্ত্রী নেহরু। নেহরু-গান্ধী পরিবার থেকে ভারতের তিনজন প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। পরের নামটি জওহরলাল নেহরুর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী।
ইন্দিরা দুই মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেন। ছিলেন ১৯৭৭ সালের মার্চ পর্যন্ত। এরপর ১৯৮০ সালে আবারও ইন্দিরার নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার গঠন করে। এই দফায় তিনি ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৮৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। ইন্দিরা ভারতের প্রথম ও একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে সমালোচিত হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর আমলে ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ নামের রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের মাধ্যমে স্বর্ণমন্দির থেকে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উৎখাত করা হয়। ইন্দিরা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তাঁর অবদান স্মরণীয়। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে ইন্দিরা নিহত হন।
মায়ের মরদেহ রেখে ওই দিনই ইন্দিরাপুত্র রাজীব গান্ধীকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে শপথ নিতে হয়েছিল। তখন রাজীব গান্ধীর বয়স ছিল ৪০ বছর। এখন পর্যন্ত তিনি ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী। নানা ও মায়ের মতো দক্ষ হাতে দেশ চালিয়েছিলেন তিনি। রাজীব গান্ধী প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় তামিল টাইগার বিদ্রোহী ও সরকারের মধ্যে মধ্যস্থতায় ভূমিকা রেখেছিলেন।
মা ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর মাত্র সাত বছর পর একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছিল ছেলে রাজীব গান্ধীকেও। ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়ু রাজ্যের চেন্নাইয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাতে গিয়ে আত্মঘাতী বোমায় নিহত হন তিনি।
পাকিস্তানে ভুট্টো-জারদারি পরিবার
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর দলটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এর মাত্র তিন বছর পর, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পিপিপি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমান পাকিস্তান) বড় জয় পায়। সিন্ধু প্রদেশের ধনী রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া আর পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ভুট্টো নিজেও পাঁচটি নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে পরাজয় মেনে রাষ্ট্রক্ষমতা ছাড়েন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ২০ ডিসেম্বর নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জুলফিকার আলী ভুট্টো শপথ নেন। তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তানে নতুন সংবিধান প্রবর্তন করা হয়। এর অধীনে ভুট্টো ১৯৭২ সালের ২১ এপ্রিল দ্বিতীয়বার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেন। ১৯৭৩ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের প্রথম একীভূত সংবিধান কার্যকর হলে ভুট্টো পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন।
পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসনামলে ১৯৭৯ সালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরবর্তী সময়ে পিপিপির হাল ধরেন জুলফিকার আলীর মেয়ে বেনজির ভুট্টো। পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত বেনজির রাজনৈতিক ক্যারিশমা দেখিয়ে সরকারপ্রধান হন। তিনি পাকিস্তান তথা পুরো মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে বেনজির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। এই মেয়াদে তিনি ১৯৯০ সালের আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে আবারও সরকারপ্রধান হন বেনজির ভুট্টো। ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির লিয়াকত বাগে নির্বাচনী সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বেনজির ভুট্টো।
বেনজির ভুট্টোর স্বামী আসিফ আলী জারদারি পাকিস্তানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট। ২০২৪ সালের মার্চে এ দায়িত্ব নেন তিনি। এর আগে ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রথম দফায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। আসিফ আলী জারদারি বর্তমানে পিপিপির কো-চেয়ারম্যান। দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন বেনজিরপুত্র বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি।
শ্রীলঙ্কায় বন্দরানায়েকে পরিবার
এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে ছিলেন শ্রীলঙ্কার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। ১৯৫৬ সালের এপ্রিলে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেন তিনি। এর আগে ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রাজনৈতিক দল শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি। তাঁকে আধুনিক শ্রীলঙ্কার (তখনকার সিলন) অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ধরা হয়। জনসাধারণের কাছে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। দেশটিতে জাতীয়তাবাদী সংস্কারের সূচনা করেছিলেন তিনি। ১৯৫৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আততায়ীর গুলিতে এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে নিহত হন।
থাইল্যান্ডে সিনাওয়াত্রা পরিবার
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ২০২৫ সালের আগস্টে বরখাস্ত হন পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা। ওই বছরের জুনে কম্বোডিয়ার সাবেক নেতা হুন সেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন তিনি। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ওই ফোনকলে নৈতিকতা লঙ্ঘন করেছিলেন পেতংতার্ন। ফলে সরকারপ্রধানের পদ হারান ফিউ থাই পার্টির এ নেত্রী। এর বছরখানেক আগে (২০২৪ সালের নভেম্বরে) প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন পেতংতার্ন।
পেতংতার্ন থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী সিনাওয়াত্রা পরিবার থেকে দেশের শীর্ষ পদে আরোহণ করা তৃতীয় ব্যক্তি। তাঁর বাবা থাকসিন সিনাওয়াত্রা থাই রক থাই পার্টি থেকে ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগপর্যন্ত এ পদেই ছিলেন তিনি।
উত্তর কোরিয়ায় কিম পরিবার
বাবা, ছেলে ও নাতি—একই পরিবারের তিন প্রজন্মের তিনজনের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে উত্তর কোরিয়ায়। কিম পরিবার ১৯৪৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া শাসন করে আসছে।
গ্রিসে পাপানড্রেউ পরিবার
ইউরোপের দেশ গ্রিসের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার হলো পাপানড্রেউ পরিবার। এই পরিবার থেকে তিন প্রজন্মের তিনজন ব্যক্তি দেশটির সরকারপ্রধান হয়েছেন। জর্জিয়াস পাপানড্রেউ তিন দফায় গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রথমবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৪৪ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত।
নিকারাগুয়ায় সামোজা পরিবার
একই পরিবারের তিনজনের দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার নজির আছে নিকারাগুয়ায়। দেশটিতে এই রাজনৈতিক পরিবার ‘সামোজা পরিবার’ নামে পরিচিক। পরিবারটি থেকে প্রথম দেশের প্রেসিডেন্ট হন আনাস্তাসিও সামোজা গার্সিয়া। তিনি ১৯৩৭ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৪৭ সালের মে পর্যন্ত প্রথম দফায় এবং ১৯৫০ সালের মে মাস থেকে ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার আগপর্যন্ত দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
পেরুর প্রাদো পরিবার
মারিয়ানো ইগনাসিও প্রাদো ছিলেন পেরুর এমন একজন রাষ্ট্রপ্রধান, পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবারের আরও দুজন দেশ শাসন করেছেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে। অন্যজন ছিলেন সরকারপ্রধান।
দুই মেয়াদে পেরুর প্রেসিডেন্ট ছিলেন মারিয়ানো ইগনাসিও প্রাদো। প্রথমবার ১৮৬৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এরপর ১৮৭৬ সালের আগস্ট থেকে ১৮৭৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি আরেক দফায় দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
- Get link
- X
- Other Apps

Comments
Post a Comment