- Get link
- X
- Other Apps
যেভাবে জাইমা রহমানকে ধীরে ধীরে তৈরি করছেন তারেক রহমান
জাইমা রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বিএনপি চেয়ারপারসন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একমাত্র কন্যা। জাইমার যখন জন্ম হয় তখন তার দাদি বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিক পরিবারে তার জন্ম তথা বেড়ে ওঠা। দাদা-দাদির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার মাঝে একদিন হয়তো তিনিই ধরবেন দলের হাল। তেমনটাই দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনীতিতে অতি ধীরে কিন্তু পরিকল্পিতভাবে একটি নতুন নাম সামনে আনা হচ্ছে। তিনি হলেন, জাইমা রহমান। গতকাল শুক্রবার জাইমা রহমান পরিবারের আরো ১৯ সদস্যকে নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেনÑ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। তাদের মতে, প্রকাশ্য রাজনীতিতে এখনো সরাসরি না এলেও বিভিন্ন কর্মকা- ও উপস্থিতি ঘিরে তার রাজনৈতিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, জাইমা রহমানকে আপাতত সরাসরি রাজনীতির বিতর্কিত মঞ্চে না এনে ধীরে ধীরে ‘গ্রুমিং’ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার উপস্থিতি, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে রাজনৈতিক পরিবেশ বোঝার সুযোগÑ সব মিলিয়ে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তারেক রহমান নিজেও অতীতে বিভিন্ন বক্তব্যে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। দলীয় সূত্রগুলোর দাবি সেই ভাবনার বাস্তব প্রয়োগ হিসেবেই পরিবারের মধ্য থেকেই একজনকে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাইমা রহমান দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেছেন। সেখানে শিক্ষা ও বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন তিনি। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের বাইরের গণতান্ত্রিক চর্চা, দল পরিচালনার কৌশল ও কূটনৈতিক বাস্তবতা বোঝাÑ এগুলো ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য জরুরি। জাইমা সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাফনে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শঙ্কর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে যখন সাক্ষাৎ করেন তখনো জাইমা রহমান উপস্থিত ছিলেন। কূটনৈতিক শিষ্টাচার, কৌশল বোঝা বা অনুধাবন করার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বংশগত রাজনীতি বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত ও বহুল আলোচিত একটি বাস্তবতা। পরিবারভিত্তিক ক্ষমতা হস্তান্তর, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং নাম-পরিচয়ের প্রভাব এখানে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের রাজনীতি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় দুই প্রধান রাজনৈতিক পরিবারের মধ্যে। শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শেখ হাসিনা। একইভাবে জিয়াউর রহমান থেকে বেগম খালেদা জিয়া। সেখান থেকে তারেক রহমান। এরপর জাইমা রহমানের নাম উচ্চারিত হওয়াই স্বাভাবিক। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর মতিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব নতুন নয়। তবে জনগণ গ্রহণ করবে কি-না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক দক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা ও মাঠের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ওপর। সারাদেশে তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। তার কন্যা বাবার মতোই হবেন এমনটা স্পষ্ট করেই বলা যায়। অর্থাৎ দাদা জিয়াউর রহমান, দাদি বেগম খালেদা জিয়া অথবা বাবা তারেক রহমানের মতোই তিনি দক্ষ হয়ে রাজনীতিতে আসবেন, তার গ্রহণযোগ্যতা হবে দাদা-দাদি অথবা বাবার মতোই।
সমালোচকরা পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে সমালোচনা করলেও বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতেও বংশগত রাজনীতি দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান। কংগ্রেস দলের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে নেহরু-গান্ধী পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী হয়ে বর্তমানে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী একই পরিবারের একাধিক প্রজন্ম রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে। সেখানে পরবিারকেন্দ্রিক রাজনীতি গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টি করেনি। এছাড়া ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে (উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ) আঞ্চলিক দলেও পরিবারতন্ত্রের প্রভাব প্রবল। পাকিস্তানের চিত্রও একই। সেখানে ভুট্টো পরিবারের সদস্যরা একে একে রাজনীতিতে এসে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো থেকে বেনজির ভুট্টো। এরপর বিলাওয়াল ভুট্টো রাজনীতিতে সরব হয়েছেন। একইভাবে শরিফ পরিবারের নওয়াজ শরিফ থেকে শাহবাজ শরিফ এরপর মরিয়ম নওয়াজ রাজনীতিতে এসেছেন।
শ্রীলঙ্কায় বংশগত রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত নাম বান্দারনায়েক পরিবার। এসডব্লিউআরডি বান্দারনায়েক থেকে সিরিমাভো বান্দারনায়েক এরপর চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা। বাংলাদেশের মতোই সেখানেও দুই পরিবারের মধ্যেই রাজনীতির প্রভাব প্রবল। মহিন্দা রাজাপাকসে থেকে গোটাবায়া রাজাপাকসে এরপর অন্যান্য ভাই ও আত্মীয়রাই এসেছেন রাজনীতিতে। নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হলেও রাজনৈতিক পরিবারই এখন প্রভাবশালী। নেপালে কোইরালা পরিবার (বিপি কোইরালা, সুশীল কোইরালা)এবং দেউবা পরিবারই (শের বাহাদুর দেউবা ও তার স্ত্রী আরজু রানা) রাজনীতিতে শক্তিশালী। সাধারণ মানুষের দাবির মুখে বাংলাদেশেও একদিন পারিবারিক ঐতিহ্যই জিয়া পরিবারের সদস্যদের রাজনীতিতে টেনে আনবে এটাই স্বাভাবিক।
বিএনপির নেতারা জানান, এখনো পর্যন্ত জাইমা রহমানের সরাসরি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা বক্তব্য নেই। বিএনপির ভেতরেও এ বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। তবে দলটির একাধিক নেতা মনে করছেন, উপযুক্ত সময় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তাকে সামনে আনা হবে। সব মিলিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যে ভবিষ্যতের জন্য নতুন মুখ তৈরির কৌশলে এগোচ্ছে, জাইমা রহমান তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেনÑ এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। প্রশ্ন একটাইÑ সময় ও রাজনীতির বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত তাকে কতটা গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
- Get link
- X
- Other Apps

Comments
Post a Comment