- Get link
- X
- Other Apps
রমজানের আগেই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, জিম্মি নিত্যপণ্যের বাজার
রমজান এলেই যেন নতুন করে আতঙ্কে পড়েন সাধারণ মানুষ। রোজার মাস শুরু হওয়ার আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, যা বহুদিনের চেনা দৃশ্য। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং রমজানের আগেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাজার সিন্ডিকেট, এবং এর খেসারত দিতে হচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষকে।
বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা যেন আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছর পেরিয়েও দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আনতে পারেনি। উল্টো স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট বেড়েছে বহুগুণ। আগের সরকারের সময় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো চোখে পড়ছে না।
বাজারে চোখ রাখলেই বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়। ডিম, মুরগি, সবজি, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, তেল, চিনি—কোনো পণ্যের দামই স্থির নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে অস্থিতিশীল ডিম ও পেঁয়াজের বাজার। চালের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের দাম কমার বদলে বেড়েই চলেছে। দু-একটি পণ্যের সামান্য দাম কমলেও তাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পান না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ একটি প্রভাবশালী বাজার সিন্ডিকেট। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে দেয়। চিনি, পেঁয়াজ কিংবা আলুর বাজারে এমন দৌরাত্ম্য নতুন নয়। প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনো সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে।
বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি খাতের অবদান ১০ শতাংশের বেশি। কৃষকের ঘামঝরা উৎপাদনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বাজারজাতকরণ। কিন্তু এখানে শুরু হয় ভোগান্তি। ফড়িয়া ও আড়তদাররা নামমাত্র দামে কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি করে, ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, আর ভোক্তাকে গুনতে হয় বাড়তি দাম।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, কৃষিপণ্যের মুনাফার প্রায় ৮০ শতাংশই চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। মজুতদারি, অতিরিক্ত মুনাফা ও ভেজালের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও বাস্তবায়ন খুব কমই হয়। দাম নির্ধারণের ঘোষণাও কার্যকর হয় না, কারণ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
রমজান ঘিরে এই অশুভ প্রবণতা আরও প্রকট। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজির দাম ইতিমধ্যেই চড়া। কাঁচা মরিচ কেজিতে ১২০ টাকা, শসা ১১০–১২০ টাকা, টমেটো ৯০–১০০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে অনেক সবজির দাম বেড়েছে ১০–৩০ টাকা।
মুরগির বাজারেও একই চিত্র। ডিমের দাম আপাতত স্থিতিশীল হলেও ব্রয়লার, দেশি ও পাকিস্তানি মুরগির দাম সপ্তাহে ১০–২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রমজানে প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে মুরগির চাহিদা বাড়ে। এখনই যদি দাম বাড়তে শুরু করে, রোজার মাসে এই পণ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে তেল, চিনি, ছোলা ও ডালের দাম কেজিতে ৩–৫ টাকা বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩৫–৪০ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ৬০–৬৫ টাকা। রসুন ১৩০ টাকা, আদা ১১০–১১৫ টাকা। চিনি প্রতি মণ ১০০ টাকা বেড়ে ৩,৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় একটি কারণ হলো চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে জটিলতা। বহির্ণঙ্গর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে শতাধিক পণ্যবাহী জাহাজ আটকা রয়েছে। ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ লাখ টনের বেশি ভোগ্যপণ্য খালাসের অপেক্ষায়, যার মধ্যে ২০টি জাহাজে রয়েছে প্রায় ১২ লাখ টন রমজান সংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য।
স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ৭–১০ দিনে পণ্য খালাস সম্ভব, সেখানে লাইটার জাহাজের সংকটে ২০–৩০ দিন সময় লাগছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই খাতেও সক্রিয় রয়েছে সিন্ডিকেট চক্র।
এবারের রমজান আসছে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পরপরই। নির্বাচন নিয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গন ব্যস্ত থাকায় বাজার তদারকিতে শৈথিল্য দেখা দিতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সুযোগে মুনাফালোভী চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে, তাই এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি।
নিত্যপণ্যের বাজারে অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মের বদলে কার্যকর হচ্ছে সিন্ডিকেটের বিধি-বিধান। সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে থাকলেও ভোক্তার স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা খুব কমই চোখে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারসহ সব ধরনের সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ অপরিহার্য।
- Get link
- X
- Other Apps

Comments
Post a Comment